পেশা হিসেবে আউটসোর্সিং: লিখেছেন মামুন সৃজন

| ফেব্রুয়ারী 14, 2015 | 0 Comments

outsourcingতথ্যপ্রযুক্তি: বহুদিন আগে মানচুমাহারা কোথাও লিখেছিলেন- “অন্যের অধীনে চাকরী করার চাইতে নিজেকে একজন উদ্যোক্তা ভাবতেই পছন্দ করি।” এই কথাটাই কিভাবে কিভাবে ইন্সপায়ারেশন হয়ে দাড়িয়েছিল খেয়াল করিনি। যদিও তখন তাঁর সাথে ব্যক্তিগত কোন পরিচয় ছিল না। তিনি আমার ফেইসবুক ফ্রেন্ডলিস্টে ছিলেন এবং পেশায় একজন ফ্রিল্যান্সার এতটুকুই জানতাম। তবে আমিও যে ক্রমশ চাকরীজীবীর বদলে উদ্যোক্তা হবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম এটা টের পেলাম অনেক পরে। যদিও আউটসোর্সিংয়ের বিষয়টা নিয়ে কখনোই তেমন কিছু ভাবিনি। তখন ভাবতাম একটা প্রতিষ্ঠান করার কথা। কিছু গ্রাফিক ডিজাইনার নিয়ে একটা ডিজাইন হাউজ করার ইচ্ছা ছিল লোকাল কাজগুলো করার জন্য। কিন্তু প্রথমত তখন একটা মাঝারি মানের প্রতিষ্ঠান করার মত পর্যাপ্ত টাকাও আমার ছিল না। একসময় এটার চাইতে আউটসোর্সিং অনেক সুবিধাজনক মনে হলো এবং সফল হতে পারলে নিজের এবং দেশের উভয়ের জন্যই লাভজনকও বটে। আর এর জন্য তেমন কোন পুঁজিরও দরকার নেই। আমার নিজের কাজের উপরে ৯ বছরের বেশী সময়ের অভিজ্ঞতা, কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট কানেকশন সবই আমার ছিল। যদিও কম্পিউটারটা ছিল অনেক দুর্বল, এবং গ্রামীনফোনের স্লো ইন্টারনেট। তারপরও কাজ চালানো যায়। এখন প্রয়োজন সুযোগ এবং কিছুটা সময়।

 

যেভাবে শুরু:

প্রিন্টিং প্রেসে চাকরী করতাম। কাজের ফাঁকে অফিসে বসে এবং অফিস শেষে মেসে ফিরে বিভিন্ন ব্লগ ফোরামে আউটসোর্সিং বিষয়ে পড়াশুনা করেই কাটিয়ে দিতাম এবং একসময় মনে হলো এবারে একটু চেষ্টা করে দেখা যায়।

ফ্রিল্যান্সিং শুরু করেছিলাম ওডেস্ক থেকে। আমার ভাগ্যটা ভালই বলতে হবে, প্রথম বিডেই কাজ পেয়ে যাই এবং সেটা শেষ করতে না করতেই আরো কয়েকটা কাজ পেয়ে যাই। ফলে সাহস আরো একটু বেড়ে গিয়েছিল। এছাড়া ওডেস্কে যাদের কাজ করেছি তারা তাদের পরিচিত বা বন্ধুদেরকেও আমার রেফারেন্স দিতে লাগলো কাজের জন্য। মনে হলো এর পেছনে যদি ফুলটাইম সময় দেয়া যায় তাহলে আমার পক্ষেও সম্ভব। এই অল্প বয়সে জীবনে অনেকগুলো চাকরী করেছি এবং ছেড়েছি তাই বর্তমান প্রেসের চাকরীটা ছাড়ার কথা ভাবতে খারাপ লাগেনি। যদিও প্রথম দিকে একটু আশঙ্কায় ছিলাম আসলে এই পেশাটিতে আদৌ টিকে থাকতে পারবো কিনা বা কিছুদিন পর সব বাদ দিয়ে আবার চাকরী খুজতে বেরোতে হয় কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি কেননা ৫ সদস্যবিশিষ্ট পুরো পরিবারটিই আমার উপরে নির্ভরশীল এবং আমার এমন কোন পুঁজি বা অন্য কোন আয়ের উৎস ছিল না যা দিয়ে আমার আয় বন্ধ থাকলেও দু’মাস চলতে পারবো। আমার এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার লোকেরও খুব বেশী কমতি হয়নি। তবে সাহস জোগানোর মত কিছু সত্যিকারের বন্ধুও যে ছিল না তা নয়। ফলে স্বাধীনতা এবং পরিবারের কাছাকাছি থাকার ইচ্ছেটাকে কোনমতেই দমানো গেল না।

 

সিদ্ধান্ত এবং তার বাস্তবায়ন:

ফলে গত বছরের ৩০ এপ্রিল চাকরী ছেড়ে সারারাতের ট্রেন ভ্রমণ শেষে ১লা মে সকালে বাড়ি পৌছেছিলাম এবং ১ বছর বাড়িতে বসেই কাজ করলাম। বলতে পারি আগের থেকে অনেক ভাল আছি।

যদিও প্রথমদিকে খুবই অসুবিধা হচ্ছিল ইন্টারনেট, বিদ্যুত, সামাজিক, পারিবারিক বিভিন্ন বিষয়ে। আমাদের সামাজিক ব্যবস্থায় আউটসোর্সিংটা পেশা হিসেবে বিশেষ পরিচিত নয় এবং মফস্বল শহরগুলোতে কেউ যখন পেশা জিজ্ঞাসা করে তখন পেশাটিকে বুঝাতে ভালই বেগ পেতে হয়। এরপর ইন্টারনেট এবং বিদ্যুতের সমস্যা বুঝাতে গিয়ে আরো কিছু কিস্ট্রোক ব্যাবহার করার কারণ নেই। তবে বিদ্যুতের সমস্যা থেকে কিছুটা রেহাই পেতে ডেস্কটপের পরিবর্তে ল্যাপটপ ব্যবহার করছি। ইন্টারনেট কানেকশন হিসেবে ব্যবহার করছি বিটিসিএল এর ব্রডব্যান্ট কানেকশন। মাঝে মাঝে তার ছিড়ে যাওয়া ছাড়া এদের তেমন কোন সমস্যা নেই।

 

বর্তমান অবস্থা:

আমার ফ্রিল্যান্সিংয়ের শুরুটা ওডেস্ক থেকে। ওখান থেকেই কিছু ভালমানুষের সাথে পরিচয় হয়েছিল যারা আমার নতুন ক্যারিয়ারটা দাড় করানোর জন্য যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন। দু’টো প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী সিনিয়র ডিজাইনার হিসেবেও কাজ করছি ১ বছরের বেশী হয়ে গেল। এছাড়া পুরোনো ক্লায়েন্টগুলোতো আছেই সেইসাথে পুরোনো ক্লায়েন্টগুলোর রেফারেন্সে আরো কিছু নির্ভরযোগ্য ক্লায়েন্ট পেয়েছি ওডেস্কে এবং ওডেস্কের বাইরে। ফলে কাজের অভাব হয়নি। যদিও বাংলাদেশে পেপাল না থাকায় অনেক নতুন ক্লায়েন্টের কাজই এখনো ছেড়ে দিতে হয়। শোনা যাচ্ছে, শীঘ্রই পেপাল বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম চালু করতে যাচ্ছে। তখন এ সমস্যা থাকবে না আশা করছি।

প্রথমদিকে একাই কাজ করতাম এবং সময়ের অভাবে অনেক কাজ ফিরিয়ে দিতাম। একসময় বুঝতে পারলাম আমি যা করছি তা ঠিক না। কেননা আমি যখন কোন ক্লায়েন্টকে ফিরিয়ে দিচ্ছি তখন স্বাভাবিকভাবেই তিনি অন্য আরেকজনকে খুজে নেবেন এবং তার ফিরে আসার সম্ভাবনা খুবই কম। ফলে প্রতিষ্ঠান করার ব্যাপারটা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। হ্যা, আমরা একটা প্রতিষ্ঠান করেছি তবে সেটাও ভার্চুয়াল। ঘড়ি ধরে কারো অফিসে আসার দরকার নেই। যে যার বাড়িতে বা ধানক্ষেতে বসে কাজ করুক তাতেও কোন আপত্তি নেই। সময়মত কাজ হলেই হলো। দেশে-বিদেশে সবমিলিয়ে ১২ জনের একটা টিম আমরা একে অপরের কাজে সহযোগিতা করছি। ব্যাপারটা মন্দ না।

পেশাটিকে আমি পছন্দ করছি তার প্রধান কারণ হিসেবে বলতো আমাকে কোথাও খুটি গেড়ে বসে থাকতে হয় না। কোথাও যেতে চাইলে ল্যাপটপটা ঘাড়ে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লেই হলো। আমি যেখানে যাবো আমার অফিসেও সেখানে! আমি আমার পরিবারকে সময় দিতে পারছি, আমার বন্ধুদেরকে সময় দিতে পারছি আর কী চাই?

কৃতজ্ঞতা: মানচুমাহারা (যাকে এ পেশায় আসার পেছনে আমার আদর্শ মনে করি)

লিখেছেন মামুন সৃজন

Category: তথ্যপ্রযুক্তি

About the Author ()

Leave a Reply