বিয়ের বয়স ১৮ এবং ১৬!

| মার্চ 11, 2015 | 0 Comments

bridalমেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮-ই থাকছে। তবে মা-বাবা চাইলে ১৬ বছরেও বিয়ে হতে পারে। বিয়ের বয়স ১৮ থেকে ১৬ করার পরিকল্পনা তীব্রভাবে সমালোচিত হওয়ার পর সরকার এই নতুন কৌশল অনুসরণের কথা ভাবছে। গত জানুয়ারি মাসে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৪’-এর খসড়া মতামতের (ভেটিং) জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। মতামতের জন্য পাঠানো খসড়ায় সরকার শর্ত আরোপ করে নতুন কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। এর আগে গত ১৮ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খসড়া আইনটির বিষয়ে যে অনুশাসন দিয়েছেন, তাতে বলা হয়েছে, ‘বিয়ের বয়স ১৮, তবে পিতামাতা বা আদালতের সম্মতিতে ১৬ বছর সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। সামাজিক সমস্যা কম হবে।’
৭ মার্চ প্রথম আলো পত্রিকায় ‘বিয়ের বয়স ১৮-ই থাকছে, মা-বাবা চাইলে ১৬’ শীর্ষক একটি প্রধান প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইট ফেসবুকসহ বিভিন্ন মহলে চলছে নানা আলোচনা, সমালোচনা। নিচে বিষয়টির পক্ষে এবং বিপক্ষে কয়েকজনের মতামত তুলে ধরা হলো।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মানসুরা হোসাইন

মেহের আফরোজনতুন আইন দিয়ে ১৮ বছরের আগে বিয়ে বন্ধ করা যাবে
মেহের আফরোজ
মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী
ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের আইনে ‘প্যারেন্টস কনসেন্ট’ বা অভিভাবকের সম্মতির শর্ত থাকায় সেসব দেশে ১৬ বছরের মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। আমাদের দেশের মা-বাবা সচেতন নন। মা-বাবা যেকোনো কারণে বিয়ে দিয়ে দিতে চাইতে পারেন। তাই আইনে কোন কোন ক্ষেত্রে মেয়েকে ১৬ বছরে বিয়ে দিতে পারবেন, তা উল্লেখ থাকবে।
তৃণমূল পর্যায়ে গিয়ে দেখেন, অনেক মা-বাবা মেয়েকে নিয়ে ঘুরছেন বিয়ে দেওয়ার জন্য। আমার কাছেই অনেকে আসছেন। মেয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেছে। বাবার বাড়ি আর ফিরবে না। ছেলের বাড়িতেও যেতে পারছে না। তখন বিয়ে ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। অনেকে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে যাচ্ছে। এখানে ধর্ষণের ফলে সে অন্তঃসত্ত্বা হচ্ছে, তা বলা হচ্ছে না। কেননা ধর্ষণের জন্য কঠোর আইন আছে। আমরা বলতে চাইছি, ছেলেমেয়ের ভালোবাসাবাসি তো আর বন্ধ করা যাবে না। উন্নত দেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে, আমাদের দেশে ঘটবে না তা তো নয়। আইনের খসড়ায় আদালতের সম্মতির কথাও বলা হয়েছে। আমাদের ১৯২৯ সালের বিদ্যমান আইনেও মেয়ের ন্যূনতম বিয়ের বয়স ১৮। তবে আমরা তা বন্ধ করতে পারিনি। এবার যে নতুন আইনটি হচ্ছে, তা দিয়ে ১৮ বছরের আগে যত্রতত্র বিয়ে বন্ধ করতে পারব। নতুন আইনে বয়স কমানোর জন্য নোটারি পাবলিকের কোনো সুযোগ থাকছে না। বাল্যবিবাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাজার পরিমাণও বাড়ানো হয়েছে।

রওশন আরা বেগমএ বয়স গর্ভধারণের জন্য উপযুক্ত নয়
রওশন আরা বেগম
প্রধান অধ্যাপক, গাইনি বিভাগ, হলি ফ্যামেলি হাসপাতাল। সভাপতি স্ত্রী ও প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞ সমিতি (ওজিএসবি)
বিভিন্ন সংগঠনের আলোচনা সভায় অনবরত আমরা আমাদের কথা বলে যাচ্ছি। আমরা এ ধরনের শর্তযুক্ত আইন পছন্দ করছি না। মেয়ের বিয়ের বয়স ১৬ হতে পারে না, তা সরকারকে বিভিন্নভাবে জানানো হয়েছে। ১৬ বছরে বিয়ে মানেই হচ্ছে শুরু থেকেই শুরু হবে নানান জটিলতা। প্রথমত, এ বয়সে একটি মেয়ের শারীরিক গড়ন কোনোভাবেই সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে না। মানসিকভাবেও বিয়ের জন্য প্রস্তুত থাকে না সে। ফলে বিয়ে, স্বামীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিড়ম্বনা শুরু হয়। এ বয়সে স্বামীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ককে ধর্ষণ বলা যায়। বিয়ের পর থেকেই শাশুড়ি ও অন্যরা সন্তান নেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। মানসিকভাবে প্রস্তুত না হওয়ায় অনেক মেয়ে পেটে সন্তান এলেও সেই সন্তান জন্ম দিতে চায় না। অনেকে অনিরাপদ গর্ভপাত করায়। শারীরিক গড়ন প্রস্তুত না থাকায় অনেকের নিজ থেকেই গর্ভপাত হয়ে যায়। যাদের গর্ভপাত হয় না, তাদের ক্ষেত্রে অপরিপক্ব সন্তান জন্ম দেওয়া, প্রসবের সময় খিঁচুনির হার বেড়ে যায়। ফলে মায়ের মৃত্যুহার বাড়ে। বাধাগ্রস্ত প্রসবের কারণে অনেকের ক্ষেত্রে ফিস্টুলার মতো জটিলতাও দেখা দেয়। এ কারণে মায়ের শুরু হয় দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা। মায়ের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। ঘনঘন সন্তান জন্মদানের কারণে ক্যানসারের ঝুঁকিও বেশি থাকে এই মায়েদের।

সালমা আলীএটি একটি রাজনৈতিক চাল
সালমা আলী
নির্বাহী পরিচালক
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি
এ ধরনের শর্তযুক্ত আইনের খসড়া আমরা কোনোভাবেই মেনে নেব না। প্রেম করে বিয়ে করতে চাইলেও সে মেয়ের বয়স ১৮ বছর হতে হবে। অন্য দেশের উদাহরণ দিয়ে লাভ নেই। প্রেম, ভালোবাসার কথা মূল বিষয় নয়, এটি হচ্ছে একটি রাজনৈতিক চাল। বিরাট একটি সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইছে সরকার। আইনে শর্ত হচ্ছে—মা-বাবার সম্মতি। তার মানে এটা হবে একধরনের জোরপূর্বক বিয়ে। আইন করেই এ ধরনের জোরপূর্বক বিয়েকে সরকার উৎসাহিত করতে চাইছে। এ ধরনের আইন হবে নারী ও শিশু অধিকারের পরিপন্থী। এ আইন থাকা না-থাকা একই কথা। এর চেয়ে ১৯২৯ সালের আইনটিই চালু থাকুক। ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনেও মেয়ের বিয়ের বয়স ১৮। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ, দেশের শিশু আইনসহ সব জায়গাতেই শিশুর বয়স ১৮। আইনে ‘বিশেষ প্রয়োজন’ বা ‘যুক্তিসংগত কারণ’-এর কথা উল্লেখ থাকলে এ ধারার অপব্যবহারই বেশি হবে। আদালতে পাবলিক প্রসিকিউটরসহ সবাই নারীবান্ধব নন। আইন ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মানসিকতার বিষয়টিও জড়িত। আইনের খসড়া চূড়ান্ত করার আগে শিশু, নারী ও মানবাধিকার নিয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনার আশ্বাস দিয়েছিল সরকার। যদি তা না করে তবে আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। মেয়েদের বিয়ের বয়স কোনোভাবেই কমানো যাবে না।

রোবায়েত ফেরদৌসসরকারের একধরনের পরিসংখ্যানিক চালাকি
রোবায়েত ফেরদৌস
সহযোগী অধ্যাপক
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আইনে এ ধরনের শর্ত আরোপ হচ্ছে দেশে বাল্যবিবাহের হার কম দেখানোর জন্য সরকারের একধরনের পরিসংখ্যানিক চালাকি। বয়স কমিয়ে এনে বাল্যবিবাহের হার কম দেখিয়ে দেশে ও বিদেশে মিথ্যা অর্জন, ক্রেস্ট আনার চিন্তা সরকারের। তবে ফল পাওয়া যাবে না। আইনে এ ধরনের শর্ত আরোপ হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক চিন্তার ফল। সামাজিকভাবেই দেশে নারী-পুরুষের স্বাস্থ্যকর সুন্দর সম্পর্ককে অনেকে মানতে চায় না। এ ধরনের শর্ত দিয়ে সেই না চাওয়াকে আরও পাকাপোক্ত করা হচ্ছে। আর স্বাস্থ্যকর ও সুন্দর সম্পর্ক নেই বলেই মেয়েরা ঘর থেকে পালিয়ে যায়। ঢালাওভাবে মেয়েরা ঘর থেকে পালিয়ে যাচ্ছে, এ ধরনের কথারও কোনো যুক্তি নেই। বয়ঃসন্ধিকালের শুরুতেই ছেলেমেয়েদের শারীরিক গঠনের পরিবর্তন, মানসিক বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য দিলে তারা ভুল পথে পা দেবে না। পিছিয়ে গিয়ে বা পশ্চাৎপদভাবে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন সরকারের উদার দৃষ্টিভঙ্গি।

তানজীব-উল আলমএটা একধরনের স্ববিরোধিতা
তানজীব-উল আলম
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
আইন অনুযায়ী সাবালকত্ব হতে লাগে ১৮ বছর। তাই মা-বাবা চাইলে বা তাঁদের সম্মতিতে এ ধরনের শর্তের কোনো যুক্তি নেই। আমরা আইনের মাধ্যমেই ১৮-কে কীভাবে ১৬ করা যায়, তার কথা ভাবছি। এটা একধরনের স্ববিরোধিতা। কোনো আইন এভাবে হওয়া উচিত নয়। বাল্যবিবাহের কারণে মেয়েরা বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলোর কথা বারবার বলছি। তাই মা-বাবা সম্মতি দিলেই কি বাল্যবিবাহের যে ঝুঁকি, তা কমে যাবে? এ ছাড়া আইনটি যে উদ্দেশ্যে করতে চাইছে, সে উদ্দেশ্যকেও ব্যাহত করবে। আইনে এ ধরনের শর্ত আরোপের আরেকটি ভয়াবহ দিক হচ্ছে, এতে করে একধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দেবে। এই বয়সী একটি মেয়ে বিয়ে নাও করতে চাইতে পারে। কিন্তু মা-বাবা সম্মতি দিয়েছেন, এই যুক্তিতে ওই মেয়েকে বিয়ে দেওয়া হবে। এতে করে মতপ্রকাশের যে অধিকার, সেই মৌলিক অধিকার রক্ষা করা সম্ভব হবে না। আর তা সংবিধানসম্মত হবে না। আইনের খসড়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুশাসন দিতেই পারেন। তবে আইন করার আগে সামগ্রিক দিক বিবেচনায় নিতে হবে।

তানিয়া হকসরকারের অন্যান্য নীতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে এই আইন
তানিয়া হক
চেয়ারম্যান, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সরকারের প্ল্যাটফর্ম শক্ত করার জন্য সরকার এ ধরনের একটি আইন করতে চাচ্ছে। অথচ দেশীয় প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতার সঙ্গে এ আইনের কোনো মিল থাকবে না। দীর্ঘদিন ধরে দেশের জনসংখ্যা, দারিদ্র্য কমানোর জন্য সংগ্রাম চলছে। মেয়ের বিয়ের বয়স ১৬ করা হলে এ ধরনের সমস্যা বাড়বে। আমার মত, একটি মেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পরেই বিয়ে করবে। আর এখানে একটি মেয়ের চাকরি তো দূরের কথা, শিক্ষা সমাপ্তির আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হবে। উচ্চবিত্ত পরিবারের বিবাহিত নারী বা মেয়েরা নিজে নিজে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সেখানে নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি মেয়ে বিয়ের পরেও পড়াশোনা করবে, তা তো বলতেই পারবে না। সরকারের শিক্ষানীতিসহ অন্যান্য নীতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে এই আইন।
সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রথম আলোর একটি গোলটেবিলে বক্তব্য দিলেন, মেয়ের বিয়ের বয়স ১৮ নয়, ২২ হওয়া প্রয়োজন। তার মানে কি সরকারের ভেতরেও সবাই মেয়ের বিয়ের বয়স ১৬ করার পক্ষে নন? উন্নত দেশের সঙ্গে তুলনা করে দেশের ভেতরের সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। আইন না মানার প্রবণতা বা আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব আছে দেশে। সেখানে আইনের মধ্যেই যদি ১৬ বছরে বিয়ে দেওয়া যাবে উল্লেখ থাকে, তখন তা হবে ভয়াবহ। মেয়েরা পড়ালেখা করে এগিয়ে যাচ্ছিল। সরকারই এখন সে পথ বন্ধ করে দিতে চাইছে।

source: prothom alo

Category: 1stpage, Scroll_Head_Line, দেশের খবর, লাইফ স্টাইল, শীর্ষ সংবাদ

About the Author ()

Leave a Reply